‘চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন’ বেশ জনপ্রিয় এক গান। ট্রাম কলকাতার ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শত রাগ-দুঃখ-অভিমান-ভালোবাসার সাক্ষী হয়েছে এই ট্রাম। ট্রাম নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান-কবিতাও। ট্রাম দেশ-বিদেশে কলকাতাকে দিয়েছে বিশেষ পরিচিতি।
তবে ট্রাম এবার শুধু গান কিংবা কবিতার লাইনেই থাকার সময় এসে গেছে। কলকাতার রাস্তায় আর দেখা যাবে না ১৫০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী যানবাহন ট্রাম। ১৮৭৩ সালে চালু হওয়া ট্রামের বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে। শহরের রাস্তা তাকে ছেড়ে যেতে হবে। ঠাঁই নিতে হবে গল্পে, গানে, স্মৃতিতে! আধুনিক ব্যস্ত জীবনে প্রয়োজন ফুরিয়েছে ধীর গতির ট্রামের। আর তাই উঠে যাচ্ছে ট্রাম লাইন।
টিংটিং ঘণ্টা বাজিয়ে চলতো এই যান। কাঠের সিটে বসে গল্প জমাতো কলকাতাবাসী এবং শহরে বেড়াতে আসা পর্যটকরা। নতুন কেউ শহরে বেড়াতে এলে ট্রামে চড়ে দেখতেন কলকাতার সৌন্দর্য। কলকাতাবাসী চাইতো ট্রাম ‘হেরিটেজ’ তকমা পাক। কিন্তু পায়নি।
এবার একেবারে বন্ধের পথে ট্রাম। তবে হেরিটেজ হিসেবে ধর্মতলা থেকে ময়দান পর্যন্ত ট্রাম চালাতে চাইছে রাজ্য পরিবহন দফতর। শুধু সাড়ে ৩ কিলোমিটার রাস্তায় ট্রাম চলবে বলেই জানা গিয়েছে।
ট্রামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যানটি আস্তে চলে। এর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে। জনবহুল কলকাতায় এই যানটি যানজটের কারণ হয়ে উঠেছে। সড়কে ট্রামলাইন থাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ধীরে চললেও রাস্তায় কোনো দূষণ তৈরি করে না ট্রাম।
পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী স্নেহাশিষ চক্রবর্তী সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছেন, ট্রামের কারণে কলকাতায় জ্যামের সৃষ্টি হয়। কারণ এটি যোগাযোগের অন্যান্য বাহনের তুলনায় অনেকটাই ধীরগতির। এজন্য এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তবে কলকাতায় বেড়াতে আসা মানুষরা যেন ট্রাম দেখতে পারেন এবং ভ্রমণ করতে পারেন সেজন্য এসপ্ল্যানেড-কিদারপুর রুটে ২ কিলোমিটার রাস্তায় ট্রাম চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। পরিবহনমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর কলকাতার ট্রামপ্রেমীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ট্রামকে আধুনিকায়ন না করে কেন এটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, পুরো ভারতে শুধুমাত্র কলকাতায় ট্রাম রয়েছে। তাই এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে।
ট্রাম নিয়ে কলকাতার হাইকোর্টে একটি রিট চলছে। গত বছরের ডিসেম্বরে আদালত নির্দেশ দেন কলকাতায় ট্রাম বন্ধ করা যাবে না। এটি সংস্কার করে চালু রাখতে হবে। আদালতে চলা এই রিটের নতুন শুনানিতে ট্রাফিক জ্যামের বিষয় এবং একটি রুটে ট্রাম চলাচল চালু রাখার বিষয়টি জানানো হবে বলে জানিয়েছেন পরিবহনমন্ত্রী স্নেহাশিষ চক্রবর্তী।
তিনি আরও জানিয়েছেন, কলকাতার শহরটি যত জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে সেটির মাত্র ৬ শতাংশ হলো রাস্তা। যা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলেছে। তা সত্ত্বেও মানুষ যেন ঠিক সময়ে অফিসে-কাজে যেতে পারেন সেজন্য ট্রাফিক পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু ট্রামের কারণে তাদের এ প্রচেষ্টা ব্যহত হচ্ছে। জানা গেছে, কলকাতা শহরে ২৭-২৮টি রুটে ট্রাম চলতো। ১৫ বছর আগেও ১২ রুটে সচল ছিল ট্রাম। শেষমেষ কলকাতায় টিকে ছিল। মাত্র ৩টি রুটে চলতো ট্রাম।
আর ১৮৮৩ সালের দিকে ভারতের ১৫টি শহরে চলতো ট্রাম। শহরগুলো ক্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর ট্রামের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসে। যখন ট্রাম চলা শুরু হয় সেই সময়ে গরুর গাড়ি, টানা রিকশা দেখা যেত কলকাতার রাস্তায়। এখন অত্যাধুনিক ক্যাব-মেট্রো চালু হয়ে গেছে। যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও রাস্তার সংখ্যা খুব একটা বাড়েনি। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধীর গতির এই যানবাহন।
কমেন্ট বক্স